শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৮ অপরাহ্ন
সেনা পরিচয়ে প্রতারণা, রাজশাহীতে ধরা পড়লো ভয়ঙ্কর ফাঁদ!
রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহীতে ঈদকে সামনে রেখে অভিনব প্রতারণার চেষ্টা রুখে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। নিজেকে সেনাবাহিনী প্রধানের ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষক এবং অন্যজনকে সেনা প্রকৌশল অধিদপ্তর (MES)-এর ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে ভারত থেকে গরু আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল দুই প্রতারক। শেষ পর্যন্ত বিজিবির গোয়েন্দা তথ্য ও চৌকস অভিযানে ধরা পড়েছে প্রতারণা চক্রের এই দুই সদস্য।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে মঙ্গলবার (২০ মে) বিকেলে রাজশাহী বিজিবি-১ ব্যাটালিয়নের দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিবুল হক জানান, আটক দুই ব্যক্তি হচ্ছেন মো. নিজাম উদ্দিন (৭১), পিতা মৃত ওয়াজিউল্লাহ মিয়া, গ্রাম কালিকাপুর, বেগমগঞ্জ থানা, নোয়াখালী এবং মো. মেহেদী হাসান (৫৫), পিতা মৃত আব্দুর রশিদ খান, গ্রাম খাগড়া, থানা আটপাড়া, নেত্রকোনা।
তারা গত ২০ মে ঢাকা থেকে রাজশাহী এসে নগরীর বিন্দুর মোড় এলাকার হোটেল গুলশানে অবস্থান নেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের প্রতারণার নাটক। নিজাম উদ্দিন নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানের ‘ম্যাডাম’-এর গৃহশিক্ষক বলে পরিচয় দেন এবং তার ‘বিশেষ পরিচিতি’ দেখিয়ে গরু আমদানিতে ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার আশ্বাস দেন। অপরদিকে, মেহেদী হাসান নিজেকে এমইএস-এর ঠিকাদার বলে দাবি করে গরু ব্যবসায়ীদের প্রভাবিত করতে থাকেন।
তাদের মূল টার্গেট ছিল ঈদকে ঘিরে ব্যস্ত গরু ব্যবসায়ীরা। তারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করানোর জন্য বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ও বিজিবি মহাপরিচালকের অনুমোদনে সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে এবং ভারত থেকে বৈধভাবে গরু আনা সম্ভব হবে—তবে শুধু ‘নির্বাচিত ব্যবসায়ীদের’ জন্য। এ সুযোগ নিতে হলে প্রতি জোড়া গরুর জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে দিতে হবে এবং ভারত থেকে ১০ হাজার গরু পার করাতে চাইলে অগ্রিম ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।
তারা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে প্রতারণার গল্প সাজায় যে কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী প্রায় টাকা দিতে প্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বিজিবি’র কাছে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল। সেই সূত্র ধরেই তারা মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে হোটেল গুলশান থেকে প্রতারক দুজনকে আটক করে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিবুল হক আরও জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে এবং এ ঘটনায় জড়িত আরও কেউ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই দুই ব্যক্তি শুধুমাত্র প্রতারণা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত পদাধিকারীদের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন—যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।”
বিজিবির পক্ষ থেকে এও জানানো হয়, ঈদ উপলক্ষে ভারত থেকে গরু চোরাচালান রোধে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং কোনোভাবেই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু ঢুকতে দেওয়া হবে না। এই সময়কে কেন্দ্র করে প্রতারণা চক্র যেমন সক্রিয় হয়, তেমনি বিজিবিও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এসব চক্র দমনে তৎপর রয়েছে।
এই ঘটনা শুধু রাজশাহীর নয়—পুরো দেশের জন্য একটি বার্তা। সেনা পরিচয় বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে কেউ গরু ব্যবসা বা অন্য কোনো ‘বিশেষ সুযোগ’-এর প্রলোভন দেখালে সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি। কারণ, এমন প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, দেশের সম্মান ও নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করতে পারে।
রাজশাহীতে এই প্রতারণা কাহিনী যেমন উদ্বেগের, তেমনি বিজিবির দ্রুত পদক্ষেপ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতারণার যে জাল বোনা হয়েছিল, সেটি সময়মতো ছিন্ন হয়েছে বলেই হয়তো অনেক পরিবার আজ বড় আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।